কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ

সরকারের বিনামূল্যের লবণ বিতরণে বড় ভোগান্তির শঙ্কা

কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে চলতি বছর ৩০ হাজার টন লবণ বিনামূল্যে সরবরাহের উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু শেষ সময়ে এর পরিমাণ কমিয়ে আনা হয়েছে।

কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে চলতি বছর ৩০ হাজার টন লবণ বিনামূল্যে সরবরাহের উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু শেষ সময়ে এর পরিমাণ কমিয়ে আনা হয়েছে। এ অবস্থায় বরাদ্দে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে মিল মালিকদের একাংশ লবণ সরবরাহে অনীহা দেখাচ্ছেন। আবার তালিকা অনুযায়ী বরাদ্দ পাওয়া কিছু জেলার মিল মালিকদের লবণ সরবরাহ করতে নিষেধ করার অভিযোগ উঠেছে। ফলে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, সরকার ৩০ হাজার টন লবণ সরবরাহের ঘোষণা দেয়ায় দেশের বিভিন্ন মিল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। সর্বশেষ গত ২৮ মে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া বরাদ্দপত্রে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কাউকে কম কাউকে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া লবণ মিল মালিক সমিতির প্রভাবশালী সদস্যদের সুবিধাজনক জেলাগুলোয় সরবরাহের অনুমোদন দেয়া হলেও অন্যদের দুর্গম ও দূরের জেলাগুলো দেয়া হয়েছে। এতে লবণ পরিবহনে ব্যয় ও জটিলতা বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই বরাদ্দ নেবেন না বলে জানিয়েছেন। এমনকি গত বৃহস্পতিবার সমিতির একজন সহসভাপতি ও সদস্য অনিয়মের অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেছেন। এতে কোরবানির ঈদে পশুর চামড়া সংরক্ষণে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সহসভাপতি মোহাম্মদ রেজুয়ানুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার পশুর চামড়া সংরক্ষণের জন্য একটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে সেই কাজকে বিঘ্নিত করা হচ্ছে। সরকারি ঘোষণার ফলে সারা দেশের ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলো লবণ ক্রয় করেনি। এখন বরাদ্দে অনিয়মের ফলে অনেক মিল মালিক লবণ সরবরাহ করে লোকসানের মধ্যে পড়বেন। সমিতির শীর্ষ নেতাদের দ্বারা এ ধরনের অনিয়ম হওয়ায় আমি সহসভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছি।’

যদিও তার এ অভিযোগের সঙ্গে একমত নন সমিতির সভাপতি নুরুল কবির। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার ৩০ হাজার টনের ঘোষণা দিলেও মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন থেকে চাহিদা এসেছে কম। এ কারণে মিলগুলোকে তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী বরাদ্দের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। কেউ এ বিষয়ে আপত্তি জানালে বরাদ্দের পরিমাণ পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া মিলারদের অনেকেই লবণ সরবরাহ করতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে কেউ চাইলে সমিতি কিংবা বিসিকের মাধ্যমে বাড়তি সরবরাহের সুযোগ পাবেন।’ সরকারের এ উদ্যোগে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

মিল মালিকদের অভিযোগ, সমিতির সভাপতি নুরুল কবির ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে সর্বমোট ৬৪০ টন লবণ বরাদ্দের অনুমতি দেয়া হয়েছে। পদ-পদবি ব্যবহার করে সহজ ও কম খরচে পরিবহনের সুযোগ নিতে চট্টগ্রাম শহরে আনুপাতিক হারে বাড়তি লবণ সরবরাহের দায়িত্ব নিয়েছেন তারা। যদিও চট্টগ্রামের মিল মালিকদের অধিকাংশকে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বরাদ্দের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

তথ্যমতে, আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৭ মে দেশের ৬৪টি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২০ কোটি টাকার আর্থিক মঞ্জুরি জ্ঞাপন ও অথরিটি প্রদান করে। ২২ মে শিল্প মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরকৃত অর্থের ভিত্তিতে লবণ মিল মালিক সমিতির সহায়তায় জেলাভিত্তিক লবণ মিলের অনুকূলে সরবরাহের পরিমাণ ও মূল্যসহ তালিকা প্রেরণ করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মনজু আরা বেগমের দেয়া ওই চিঠি ও তালিকা পাওয়ার পর মিল মালিক সমিতির সদস্যরা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বরাদ্দপত্র সংশোধন কিংবা জেলা অনুযায়ী পরিবহন খরচ বাড়ানো না হলে অনেকেই লবণ সরবরাহ বন্ধ রাখবেন বলে জানান।

মন্ত্রণালয়ের পত্র অনুযায়ী, ঢাকায় আটটি মিল ৬৪০ টন, চট্টগ্রামে পাঁচটি মিল ৬৪০ টন, রাজশাহীতে পাঁচটি মিল ৩২০ টন, ময়মনসিংহে তিনটি মিল ২৪০ টন, রংপুরে পাঁচটি মিল ৩১০ টন, খুলনায় দুটি মিল ২৫০ টন, বরিশালে তিনটি প্রতিষ্ঠান ২০০ টন, কুমিল্লায় চারটি প্রতিষ্ঠান ২৪০ টন, সিলেটে চারটি প্রতিষ্ঠান ২৮০ টনসহ জেলাভিত্তিক লবণ বরাদ্দের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বনিম্ন খাগড়াছড়িতে ৫৬ টন লবণ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে চাহিদা চূড়ান্ত করে সরবরাহ আরো কিছুটা কমানো হয়েছে। জেলাভেদে প্রতি টন লবণের মূল্য সর্বনিম্ন সাড়ে ১২ হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৫ শতাংশ ভ্যাট কর্তনের পাশাপাশি প্রতি টন লবণ পরিবহনের জন্য ১ হাজার টাকা দেয়া হবে। এক্ষেত্রে প্রভাবশালী মিল মালিকরা ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থাসম্পন্ন জেলাগুলোয় বরাদ্দ নিয়ে পরিবহন খরচ থেকে লবণে বেশি লাভ করবেন বলে অভিযোগ সাধারণ ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের।

ঘোষণা দিয়ে অপ্রতুল সরবরাহ ও অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুজ্জামান বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোরবানির সময় দেশে লবণের চাহিদা প্রায় ৩৪ হাজার টন। তবে বৈঠকের সময় তাৎক্ষণিকভাবে ৩০ হাজার টন বিনামূল্যে দেয়ার কথা থাকলেও মাঠ পর্যায় থেকে চাহিদা এসেছে কম। এ কারণে ঘোষণার চেয়ে কম লবণ সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া সরকারি ঘোষণার আগেই চামড়া ব্যবসায়ী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীরা লবণ সংগ্রহ করায় এবার কোরবানির সময় লবণের সংকট হবে না।’ এক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও অনিয়ম কিংবা স্বজনপ্রীতির কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি।

জানতে চাইলে বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক (লবণ সেল) সরোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মিল মালিক সমিতি ও বিসিকের সঙ্গে আলোচনা করেই বরাদ্দের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কাছে এ তালিকা দেয়া হয়েছে। এতে কেউ যদি মনে করেন লবণ সরবরাহ করে তার লোকসান হবে, তাহলে বিসিকের কিছুই করার নেই। এক্ষেত্রে বাড়তি ঘোষণা দেয়া হলেও মাঠ প্রশাসনের চাহিদা পাওয়ার পর বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের পরিমাণ কমানো হয়েছে।’ এ ঘোষণার ফলে মাঠ পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা লবণ কেনা কমিয়ে দেয়ায় কোরবানির পশুর চামড়া সংকটে জটিলতা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে দাবি করেছেন তিনি।

মিল মালিকরা দাবি করেছেন, প্রতি বছর কোরবানির ঈদের আগে ব্যবসায়ী, এতিমখানা, মাদ্রাসা ও মসজিদ কমিটিগুলো বাজার থেকে লবণ সংগ্রহ করে থাকেন। তবে এবার সরকারি উদ্যোগে সমপরিমাণ লবণ বিনামূল্যে দেয়ার ঘোষণায় বিক্রি কমে গেছে। এ কারণে মাঠ পর্যায়ে চাহিদার তুলনায় লবণের সরবরাহ অনেক কম। এখন ঘোষণা দিয়ে সরবরাহের পরিমাণ কমিয়ে আনায় কোরবানির ঈদের দিন বা ঈদের পর কয়েকদিন দেশে লবণের সংকট দেখা দিতে পারে। ফলে দামও বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন মিল মালিকরা। এজন্য জেলাভেদে পরিবহন খরচ পুনর্নির্ধারণ ও বরাদ্দের পরিমাণ সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরও